উত্তর কোরিয়ার জীবাণু অস্ত্রের সক্ষমতা ও হুমকি

২০০৬ সালে যখন উত্তর কোরিয়া প্রথমবারের মতো পারমাণবিক পরীক্ষা চালালো, তার ৫ মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তারা দেশটির কংগ্রেসে এই মর্মে সতর্কবার্তা দেয় যে, উত্তর কোরিয়া গোপনে জীবাণু অস্ত্র তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার হাতে অনেক আগ থেকেই অ্যানথ্রাক্স এবং গুটিবসন্ত রোগের জীবাণু বিদ্যমান। বেশ কয়েক দল বিজ্ঞানী নিযুক্ত করে এ ক্ষেত্রে আরোসমূহ উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল দেশটি। তবে কিছু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার ফলে দেশটি পিছিয়ে রয়েছে বলে ওই সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, আপাতত উত্তর কোরিয়ার হাতে কেবল প্রাথমিক জৈব প্রযুক্তির কাঠামো রয়েছে।
তবে এক দশক পরে এসে, উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এখন আর নেই। উত্তর কোরিয়া ধীরে ধীরে উন্নত জীবাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার পথে এগিয়ে গেছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্র এবং এশিয়ান ইন্টেলিজেন্সের কর্মকর্তা এবং অস্ত্রবিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি এখন উত্তর কোরিয়ার আছে। আছে বিপুলমাত্রায় জীবাণু উৎপাদনে সক্ষম কারখানাও। আছে জিনগত পরিবর্তন গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক ল্যাব। অন্যদিকে, দেশটির নেতা কিম জন উন প্রতিনিয়ত দেশটির বিজ্ঞানীদের জৈবিক প্রযুক্তি সংক্রান্ত উন্নত পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাঠান। আবার, উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে জৈবপ্রযুক্তিও বিক্রি করে উত্তর কোরিয়া। জৈব প্রযুক্তি খাতে উত্তর কোরিয়ার বর্তমান সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। কারণ, এমনিতেই দেশটির হাতে নানা রকম বিধ্বংসী অস্ত্র-প্রযুক্তি আছে। এর সঙ্গে যদি জীবাণু অস্ত্রের সক্ষমতা যুক্ত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্রদের জন্য তা হবে ভয়াবহ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, চাইলেই যেকোনো সময়ে উত্তর কোরিয়া বিপুলমাত্রার জীবাণু উৎপাদন শুরু করতে পারে। এ প্রসঙ্গে নানা গোপন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, কিম জন উন জীবাণু অস্ত্র তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন- এমন কোনো প্রমাণ এখনো পর্যন্ত মেলেনি। তবে কেন তিনি বাণিজ্যিক আকারে জীবাণু অস্ত্র উৎপাদনের পথে এগোচ্ছেন না তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে আছেন বিশ্লেষকরা। এই বিষয়ে নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, উত্তর কোরিয়ার যে জীবাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা আছে, তা আমরা জানি। তবে কেন তারা এমন ক্ষমতা অর্জন করেছে এবং সক্ষমতা থাকার পরেও, কেন এখনো পর্যন্ত তারা জীবাণু অস্ত্রের উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে না- তা একটি বড় প্রশ্ন। তবে জীবাণু অস্ত্র নিয়ে উত্তর কোরিয়ার প্রকৃত কার্যক্রম সম্পর্কে এখনো ধোঁয়াশার আবর্তে রয়ে গেছেন বিশ্লেষকরা। এর অন্যতম কারণ হলো, উত্তর কোরিয়া অত্যন্ত চালাকির সঙ্গে জৈবিক প্রযুক্তিগত গবেষণাসমূহ বেসামরিক স্থাপনায় রেখেই পরিচালনা করে আসছে। উত্তর কোরিয়া যদি কৃষি এবং ওষুধ খাতে কাজ করা ওইসব বেসামরিক স্থাপনায় লুকিয়ে জীবাণু অস্ত্র তৈরির কার্যক্রম চালিয়ে যায়, তবে তা শনাক্ত করা দুরূহ। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিশ্লেষক বলেন, যদি তারা (উত্তর কোরিয়া) আগামীকালও জীবাণু অস্ত্রের উৎপাদন আরম্ভ করে, আমাদের তা জানার উপায় নেই।
জীবাণুর কারখানা

উত্তর কোরিয়ার মতো একটি গোপনীয়তা বজায় রাখা দেশে জীবাণু অস্ত্র তৈরি কিংবা এ সংক্রান্ত গবেষণায় তারা কতদূর এগিয়েছে, তা জানা কঠিন। আর উত্তর কোরিয়া সবসময়ই জীবাণু অস্ত্র তৈরির কার্যক্রমের কথা অস্বীকার করে আসছে। দেশটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এ সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম বিশ্বের কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছে। তবে, ২০১৫ সালে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে। ওই বছরের ২৮শে মে’তে যুক্তরাষ্ট্র জনসম্মুখে স্বীকারোক্তি দেয় যে, ভুলবশত তারা জীবাণু অস্ত্রের নমুনাবাহী একটি চালান উত্তর কোরিয়ার সেনা ঘাঁটিতে পাঠিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ৪ই জুন উত্তর কোরিয়া জাতিসংঘে অভিযোগ দায়ের করে, যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার জনগণের ওপর জীবাণু অস্ত্রের প্রয়োগের চেষ্টা করছে। এর ঠিক দুদিন পরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জন উন সে দেশের একদল ভিডিও সাংবাদিককে পিয়ংইয়ং বায়োটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের একটি জৈবিক সার উৎপাদন কারখানা ঘুরে দেখান। তবে ওই সফরের ভিডিও পর্যালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকরা বেশ কিছু সন্দেহজনক জিনিস দেখতে পান। ওই কারখানায় এমন কিছু যন্ত্রপাতির উপস্থিতি ছিল, যা সার তৈরির পাশাপাশি জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। খটকাটা লাগে তখন, যখন বিশেষজ্ঞরা এটা বুঝতে পারেন যে, অবরোধের কবলে থাকা উত্তর কোরিয়ার পক্ষে ওইসব যন্ত্রপাতি বিশ্ববাজার থেকে কেনার কোনো উপায় ছিল না। তারা কালোবাজারিদের কাছ থেকে মূল দাম থেকে অনেক বেশি দাম দিয়ে এসব যন্ত্রপাতি কিনেছে। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, যেখানে উত্তর কোরিয়া চাইলে অনেক কম দামে চীনের কাছ থেকে ওইসব সার কিনতে পারে, সেখানে কালোবাজার থেকে চড়া দামে যন্ত্রপাতি কিনে তারা সার উৎপাদন করতে চাইছে কেন? আর কিম জন উন কেনই বা সেসব যন্ত্রপাতি সাংবাদিকদের দেখালেন? ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের জীবাণু অস্ত্রের চালানের জবাবে, উত্তর কোরিয়াও কৌশলে দেখিয়ে দেয় যে, তাদেরও জীবাণু অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা আছে এবং তাদের সঙ্গে লাগতে গেলে ছাড় দেয়া হবে না কাউকেই। এ প্রসঙ্গে জেমস মার্টিন সেন্টারের উত্তর কোরিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মেলিসা হানহাম ওই ভিডিও চিত্রের প্রতিক্রিয়ায় নিজের এক ব্লগে লেখেন, যদি কিম জন উনের ভিডিওতে দেখতে পাওয়া ওইসব যন্ত্রপাতি বর্তমানে কোনো ধরনের জীবাণু অস্ত্র উৎপাদনে ব্যবহার করা না-ও হয়, এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত বাস্তব যে, অদূর ভবিষ্যতেই তা করা হবে।
নির্দেশের অপেক্ষা

ধারণা করা হচ্ছে, উত্তর কোরিয়া জীবাণু অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম। তবে দেশটির এই সক্ষমতার মাত্রা কতখানি, তা নির্ণয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকরা। এ সমপর্কে যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা জানান, উত্তর কোরিয়া যেকোনো সময় জীবাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে এমন কথা মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের কোরিয়াগামী সব সেনাদের জীবাণুরোধী টিকা দেওয়া হয়। আমরা আশঙ্কা করি, এটা (জীবাণু অস্ত্র) তাদের (উত্তর কোরিয়ার) আছে। তারা চাইলেই এটা ব্যবহার করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্লেষকরা মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার হাতে অ্যানথ্রাক্স, গুটি বসন্ত এবং প্লেগের জীবাণু আছে। মূলত কখন কীভাবে তা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেবেন কিম জন উন, সেই নির্দেশের অপেক্ষায় আছে উত্তর কোরিয়া।

[ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে]