রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

বংশ পরিচয়ঃ

রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম এর বংশ সারা বিশ্বের সেরা ও উত্তম বংশ। আপন পর সবাই অকপটে তা স্বীকার করত। আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বোচ্চ বংশোদ্ভত হওয়ার দিকে ইঙ্গিঁত করে বলেছেনঃ “আল্লাহ তাঁর রিসালত বা পয়গামের দায়িত্ব কাকে দিচ্ছেন সে ব্যাপারে অনেক জ্ঞাত।” (সূরা আন আমঃ ১২৪)

আবু সুফিয়ান (ইসলাম গ্রহনের পূর্বে) যখন রোমের সম্রাটের কাছে রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম এর পরিচয় দিচ্ছিল তখন সেও বলেছিল যে, তিনি আমাদের মধ্যে উচ্চ বংশীয় ব্যক্তি। তখন রোম সম্রাট হিরাকল বলেছিলেনঃ “তেমনি নবী রসূলগণ সর্বোচ্চ বংশ ও গোত্রে প্রেরীত হয়ে থাকেন।” (সহীহ সীরাতুন নব্বীয়াহ, পৃঃ ৯।)

নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম নিজেও বলেছেনঃ “আমি বনী আদমের সর্বোত্তম বংশে প্রেরীত হয়েছি। আমার যুগই সর্বশেষ্ঠ যুগ।”(সহীহ আল বুখারীঃ ৪/১৫১)

অপর এক হাদীসে আছে, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআলা কিনানা গোত্র থেকে কুরাইশকে বাছাই করেন, আবার কুরাইশদের থেকে বনু হাশিমকে বাছাই করেন এবং বনূ হাশিম থেকে আমাকে বাছাই করেন।” (মুসলিম (২২৭৬), তিরমিযী (৩৬০৬), মুসনাদু আহমদঃ ৮/১০৭, হা/ ১৭১১১, , সিলসিলা সহীহাঃ ৩০২।)

পবিত্র বংশধারাঃ

রসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র বংশধারা নিম্নরূপঃ

মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) ইবনে আব্দিল্লাহ, ইবনে আব্দিল মুত্তালিব, ইবনে হাশিম, ইবনে আব্দিমানাফ, ইবনে কুছাই, ইবনে কিলাব, ইবনে মুররাহ, ইবনে কাআ’ব, ইবনে লুওয়াই, ইবনে গালিব, ইবনে ফেহের (কুরাইশ), ইবনে মালিক, ইবনে নযর, ইবনে কিনানা, ইবনে খুযাইমাহ, ইবনে মুদরিকাহ, ইবনে ইলিয়াস, ইবনে মুদ্বার, ইবনে নাযার, ইবনে মাআ’দ, ইবনে আদনান, ইবনে আদু, ইবনে মাইসা’, ইবনে সালামান, ইবনে এওয়ায, ইবনে বূয, ইবনে ক্বামওয়াল, ইবনে উবাই, ইবনে আওয়াম, ইবনে নাশিদ, ইবনে হাযা, ইবনে বিলদাস, ইবনে ইয়াদলাফ, ইবনু ত্বাবিখ, ইবনু জাহিম, ইবনু নাহিশ, ইবনু মাখী, ইবনু আইফী, ইবনু আবকার, ইবনু উবাইদ, ইবনু আলদুআ’, ইবনু হামদান, ইবনু সাবজ, ইবনু ইয়াসরাবী, ইবনু ইয়াহযান, ইবনু ইয়ালহান, ইবনু আরআওয়া, ইবনু আইফা, ইবনু যীশান, ইবনু আইসার, ইবনু আকনাদ, ইবনু ইহাম, ইবনু মুকছির, ইবনু নাহিছ, ইবনু যরাহ, ইবনু সুমাই, ইবনু মযযী, ইবনু ইওয়ায, ইবনু আরাম, ইবনু কায়দার, ইবনু ইসমাঈল, ইবনু ইবরাহীম, ইবনু তারা (আযর), ইবনু নাহুর, ইবনু সারুজ, ইবনু রাঊ, ইবনু ফাইজ, ইবনু আবির, ইবনু আরফাকশাও, ইবনু সাম, ইবনু নূহ, ইবনু লামক, ইবনু নাতুশাইহ, ইবনু আখনূ’, ইবনু ইদ্রিস, ইবনু ইয়ারিদ, ইবনু মালহালঈল, ইবনু কায়নান, ইবনু আনূশ, ইবনু শীছ, ইবনু আদম আলাইহিসসালাম। -(রাহমাতুল্লিল আলামীন, দ্বিতীয় খন্ড, পৃঃ ২৫-৩১, কাজী মুহাম্মদ সুলাইমান মনছুরপূরী)

আব্দুল্লাহ ও আমেনাঃ

কুরাইশ সর্দার আব্দুল মুত্তালিবের ছিল দশ পুত্র। এদের সকলেই ছিলেন বিশিষ্ট ও খ্যাতিমান। তাঁর সকল পুত্রের মধ্যে আব্দুল্লাহ খুবই প্রশংসনীয় গুণাবলী ও কেন্দ্রীয় মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর পিতা বিয়ে দিয়েছিলেন বনূ যুহরার সর্দার ওহাব এর কন্যা আমেনার সঙ্গেঁ, যাঁকে সে সময় উচ্চ বংশ, সম্মান ও প্রভাব প্রতিপত্তির দিক দিয়ে কুরায়শদের ভিতর সবচেয়ে সম্মানিত মহিলা মনে করা হত।

রসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম মাতৃগর্ভে থাকাকালেই তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি সিরিয়া সফর থেকে ফেরার পথে মদীনায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তথায় মৃত্যু বরণ করেন। ‘দার আল্ নাবেগা আলজা’দী’ নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। (আর রাহীকুল মাখতুম, ছফীউররাহমান মুবারকপুরী, পৃঃ ৫৩।) হযরত আমেনা তাঁর জন্মের পূর্বেই এমন বহু নিদর্শন দেখতে পান যাদ্বারা বোঝা যেত যে, তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ অত্যুজ্জল ও মর্যাদাকর হবে।” (নবীয়ে রহমত- সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী- ১১৩)

জন্মঃ

রসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম ‘আমুল ফীল’ অর্থাৎ হস্তি বাহিনীর অভিযানের বছর প্রসিদ্ধ বর্ণনা মতে রবিউল আওয়াল মাসের ১৭ তারিখ মুতাবিক ৫৭০ খৃষ্টাব্দ শুক্রুবার দিন সকালে জন্ম গ্রহণ করেন। এটি ছিল মানবতার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোকোজ্জল ও বরকতময় দিন।

নাম করণঃ

হযরত মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম হতেই মা আমেনা এসংবাদ দাদা আব্দুল মুত্তালিবকে পাঠান। সংবাদ পেতেই তিনি ছুটে আসেন, পরম স্নেহে দেখেন, যত্নের সঙ্গেঁ কোলে নিয়ে কা’বার ভেতর প্রবেশ করেন, আল্লাহর হামদ বর্ণনা করেন এবং দোয়া করেন। অতঃপর তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ’। আরবে এনাম ছিল একেবারেই নতুন। ফলে লোকেরা খুব বিস্মিত হয়। (সীরাতে ইবনে হিশামঃ ১/১৫৯-৬০, ইবনু কাছীরঃ ১/২১০।)

নয় বছর বয়সে রসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চাচা হযরত আবু তালেবের সাথে বানিজ্জিক সফরে সিরিয়া যান। সিরিয়ার প্রসিদ্ধ নগরী ‘বুছরা’ নামক স্থানে পৌঁছার পর ‘বুহায়রা’ নামক এক ধর্মজাযকের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে। বুহায়রা বিভিন্ন আলামতের মাধ্যমে রসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম কে চিনতে পেরে তিনি সহ তাঁর কাফেলাকে খুব বেশী খাতির যত্ন করলেন এবং হযরত আবু তালেবকে বললেন যে, আপনি আপনার ভাতিজাকে নিয়ে মক্কায় চলে যান। ইহুদীদের হাত থেকে একে বিশেষ ভাবে হিফাজত করবেন। কারণ ভবিষ্যতে এ বিরাট মর্যাদার অধিকারী হবেন। এরপর  হযরত আবু তালেব তাঁকে নিয়ে নিরাপদে মক্কায় ফিরে আসেন। (সীরাতুন নব্বীয়্যাহ, পৃঃ ২৯-৩১।)

লালন পালনঃ

রসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম এর লালন পালন বিশেষ নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হয় এবং জাহিলিয়াতের নাপাক ও খারাপ অভ্যাস সমূহ থেকে আল্লাহপাক তাঁকে সর্বদাই দুরে ও মুক্ত রাখেন। তাঁকে তাঁর জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে লোকেরা প্রথম থেকেই সবচেয়ে বেশী প্রশংসনীয় গুণাবলী, উন্নত মনোবল, উত্তম চরিত্রে বিভূষিত, লাজনম্র, সত্যবাদী, আমানতদার, কটুক্তি ও অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ থেকে দুরে বলে মনে করত। এমন কি তাঁর জাতির লোকেরা তাঁকে ‘আল্ আমীন’ বিশ্বস্ত, আমানতদার নামে স্মরণ করত। তিনি আত্মীয়তার দিকে খেয়াল রাখতেন, লোকের দুর্বহ বোঝা হালকা করতেন এবং তাদের প্রয়োজন মেটাতেন। তিনি মেহমানদারী করতেন, কল্যাণমূলক ও তাকওয়া ভিত্তিক কাজে কর্মে অন্যদেরকে সাহায্য করতেন। (নবীয়ে রহমত, পৃ ১১৮।)

পবিত্র সন্তান-সন্ততিঃ

নবী কারীম (সাঃ) এর পুত্র সন্তানদের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতানৈক্য রয়েছে। তবে কাসেম এবং ইব্রাহীম সম্পর্কে সবাই একমত। তৈয়ব এবং তাহের দুটি আব্দুল্লাহর উপাধী ছিল।

সন্তানগণঃ

১ – আল কাসিম, তিনি খাদীজার গর্ভে জন্মলাভ করেন এবং বাল্যকালেই মৃত্যু বরণ করেন। তিনি ছিলেন সর্ব প্রথম সন্তান। একারণেই নবী কারীম (সাঃ) কে ‘আবুল কাসেম’ বলে ডাকা হত।

২ – আব্দুল্লাহ (তৈয়ব ও তাহির) তিনিও খাদীজার গর্ভে জন্মলাভ করেন এবং বাল্যকালে মৃত্যু বরণ করেন।

৩ – ইব্রাহীম (রাঃ) তিনি মারিয়া কিব্তিয়ার গর্ভে জন্মলাভ করেন এবং বাল্যকালে মৃত্যু বরণ করেন।
৪ – ফাতিমা, তিনি আলী (আঃ) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

নবী (সাঃ) এর পরবর্তী বংশধারা তাঁর কন্যা ফাতিমা (সাঃ) এর সন্তান-সন্ততিদের মাধ্যমেই অব্যাহত রয়েছে। ফাতিমা (সাঃ) এর সন্তান-সন্ততি সাদাতে বনী ফাতিমা নামে প্রসিদ্ধ।